খাদ্য শস্যে ভারী ধাতু এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকিঃ বৈশ্বিক গবেষণা

হালিমা তুজ্জ সাদিয়াঃ

পরিমাণগত এবং গুণগত টেকসই উন্নয়নের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার অগ্রাধিকার সবার উপরে। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে অপ্রত্যাশিতভাবে দূষণ বেড়ে যাওয়ায়- বিরূপ প্রভাব পড়ছে ফসলের গুণগত মানের উপর। ফলশ্রুতিতে খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবস্বাস্থ্য আজ হুমকির মুখে। এই অপ্রত্যাশিত দূষকগুলির মধ্যে ভারী ধাতু অন্যতম। প্রকৃতিতে পাওয়া প্রায় সব ভারী ধাতুই মাত্রাভেদে বিষাক্ত হয় এবং এসব ধাতু মানব বিপাকে সমস্যা সৃষ্টি করে যার দরুন রোগাক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভারী ধাতব দূষণ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে যা পরিবেশ এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নগরায়ন, অযাচিত সম্পদ ও ভূমি ব্যবহার এবং শিল্পায়ন। শিল্প বিপ্লব এবং বিশ্বায়নের পর থেকে পরিবেশে দূষিত পদার্থের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এটিএসডিআর সংস্থা- বিপাক এবং অন্যান্য জৈবিক কার্যাবলির দিককে কেন্দ্র করে শীর্ষ ২০ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক ভারী ধাতু। ভারী ধাতুগুলির মধ্যে রয়েছে- মার্কারি, আর্সেনিক, লেড, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ইত্যাদি।

আবার কিছু ভারী ধাতু যেমন- কপার, আয়রন, জিংক এমনকি ক্রোমিয়াম(III) ইত্যাদি জীবদেহের বিপাকীয় প্রক্রিয়াগুলির প্রয়োজনীয় উপাদান যেমন- সাইটোক্রোম এবং এনজাইমের কার্যকলাপের সাথে জড়িত। নিকেল ইউরিয়েজ এনজাইমের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান, তবে এটি অতিরিক্ত মাত্রায় থাকা মানব স্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

কোথা থেকে আসছে এসব ভারী ধাতু?

বর্তমানে বিভিন্ন উৎস থেকে ভারী ধাতু নির্গত হচ্ছে এবং এসব ধাতু পরিবেশের উপাদানের সাথে মিশে যাচ্ছে। কৃষি নির্ভর দেশে ফসল উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম মাটি কিন্তু বিভিন্ন উৎস থেকে আসা ভারী ধাতু এবং ধাতব পদার্থ যেমন- লেড, কপার, জিংক, নিকেল, ক্যাডমিয়াম, মার্কারি, কোবাল্ট, স্টিবিয়াম, টিন ইত্যাদি মাটিকে দূষিত করছে। মাটির পরিবেশ এবং ভারী ধাতবগুলির প্রাথমিক উৎস কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান, পশু-পাখির অপচনশীল অংশ, দূষিত পানি দ্বারা সেচ, ধাতব কীটনাশক, ফসফেট-উপাদানসমৃদ্ধ সার, নর্দমার বর্জ্য ইত্যাদি। প্রাকৃতিক উৎস ছাড়া মানবসৃষ্ট কারণ যেমন- জীবাশ্ম জ্বালানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত না করার দরুন ভারী ধাতু দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। গবেষকদের ধারনা- কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি মার্কারি দূষণের একটি প্রধান উৎস। ক্যাডমিয়াম আসছে রাসায়নিক সার থেকে এবং ক্রোমিয়াম ও সীসা আসছে মূলত শিল্পকারখানা, ইলেক্ট্রনিক এবং মেডিকেল বর্জ্য থেকে।

এছাড়াও বৈদ্যুতিক বর্জ্য, বিভিন্ন শক্তি ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা খনি, বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্প, টেক্সটাইল, চামড়াশিল্প, ইলেকট্রোপ্লেটিং কারখানা, বর্জ্য জল পরিশোধনাগার এবং ই-বর্জ্য ইত্যাদি থেকে ভারী ধাতু পরিবেশে ছড়িয়ে পরছে। শিল্প বর্জ্য নিকটস্থ জমি সবচেয়ে বেশি ভারী ধাতু দূষণের শিকার।

গবেষকদের ধারনা- বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত ভারী ধাতু শেষ পর্যন্ত মাটিতে জমা হয়ে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। শিল্প-কারখানার কাছাকাছি জন্মানো ফসল বা গাছগুলোতে বেশি ভারী ধাতু পাওয়া যায়। এই দূষিত মাটি থেকে উৎপাদিত ফল, ফসল এবং শাকসবজি গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টিনাল ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। মার্কারি দূষিত মাটিতে জন্মানো বিভিন্ন ধরনের সবজি যেমন- পালংশাক, কলমিশাক,লেটুস এগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বর্তমানে গ্রিনহাউজে জন্মানো শাকসবজিও ভারী ধাতুর দূষণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। গ্রিনহাউজে উৎপাদিত সবজিতে ভারী ধাতু দূষণের কারণ- পর্যাপ্ত যত্ন এবং উপযুক্ত ও বিশুদ্ধ উপাদান বা আলোর অভাব বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি

পরিবেশগত দূষক- খাদ্য সুরক্ষা এবং মানব স্বাস্থ্যের সাথে সরাসরি জড়িত। পরিবেশে ভারী ধাতুগুলির ঘনত্ব সাম্প্রতিক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, খাদ্যচক্রে রাসায়নিক দূষণের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে যা মারাত্মক হুমকিস্বরূপ ।

অনেক সময় ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও সীসার অধিক ব্যবহার ও এদের কিছু রাসায়নিক গঠন পরিবেশে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। উদাহরনস্বরুপ- ষড়যোজী ক্যাডমিয়াম, পারদ বাষ্প যা ফুসফুস বিকল করে দিতে পারে। ক্রোমিয়াম (VI) ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী, ক্যাডমিয়াম হাড়ের রোগ সৃষ্টি করে, পারদ ও সীসা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে ক্ষতি করে। এই ধাতুগুলি পানি, মাটি এবং খাদ্য দ্রব্যে সরাসরি প্রবেশ করে- ফলশ্রুতিতে গুরুতর মানব স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলি যেমন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল ক্যান্সার, অপুষ্টি দেখা দিতে পারে।

সীসা দূষণ মানসিক বিকাশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে বাচ্চাদের মধ্যে নিউরোলজিকাল এবং কার্ডিওভাস্কুলার রোগের সৃষ্টি করে।কিছু ভারী ধাতব যেমন- লেড, ক্যাডমিয়ামের কারসিনোজেনিক প্রভাব রয়েছে এবং এগুলি হাড়ের ভাঙা এবং ক্ষয়রোগ, কার্ডিওভাস্কুলার জটিলতা, কিডনি বিকল, হাইপারটেনশন, লিভার, ফুসফুস এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।

কিছু কিছু ভারী ধাতু ক্যান্সার তৈরি করে না যেমন, ক্রোমিয়াম, কপার তবুও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। দেখা দিতে পারে নিউরোলজিক জটিলতা, মাথাব্যথা এবং লিভারের রোগ। ক্রোমিয়াম (VI) এবং ক্রোমিয়াম (III) অন্যান্য আয়নিকের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক এটির স্থায়িত্বের দিক থেকে সর্বোর্ধ্বে। বৈদ্যুতিক বর্জ্য থেকে ছড়ানো ভারী ধাতু মানব দেহে বিষক্রিয়াজনিত প্রভাব ফেলে যা DNA কে ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে (জেনোটক্সিক) যার দরুন জন্মগত ত্রুটি, জেনেটিক ডিজঅর্ডার, শিশুমৃত্যু এবং স্নায়ুবিক ত্রুটি দেখা যায়। এই ভারী ধাতুগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব ছাড়াও মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন উপকারী প্রাণকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে ফলশ্রুতিতে মাটির উর্বরতা এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

কিভাবে ভারী ধাতু খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে?

উদ্ভিদ শিকড় দিয়ে মাটি থেকে পানি এবং খনিজ পুষ্টি গ্রহণ করে। ভারী ধাতুগুলো পানি এবং খনিজ পুষ্টির সাথে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে এবং পরবর্তীতে আয়ন আকারে স্থানান্তরিত হয় এক্ষেত্রে উদ্ভিদ টিস্যুর জাইলেম ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ঘনত্বে ভারী ধাতু জমা হতে পারে। সেই উদ্ভিদ বা ফসল গ্রহণ করার ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা থাকে।

প্রতিরোধে করণীয়

উন্নত মানব স্বাস্থ্যের জন্য খাদ্য নিরাপত্তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে ভারী ধাতু দূষণ রোধ করতে হবে। এজন্য ফসলি জমিতে সেচ, স্ল্যাজ এবং শিল্পকারখানার বর্জ্যপ্রবাহের ভারী ধাতুর নৃতাত্ত্বিক উৎসগুলি যথাযথ সুব্যবস্থায় আনতে হবে। মাটিতে ভারী ধাতুর দূষণ প্রতিকার রোধে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ভারী ধাতুর প্রতিকার রোধে পরিবেশগত জৈবিক এবং রাসায়নিক ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে ন্যানো টেকনোলজির উদ্ভাবনগুলি সহায়তা করতে পারে। শিল্পকারখানার বর্জ্য রিসাইকেল করার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন কারখানা থেকে দূরবর্তী স্থানকে কৃষিক্ষেত্র স্থাপন করতে হবে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কৃষিখাতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। ড্রেনে বা পয়ঃনিষ্কাশনের ময়লা কামাতে হবে। পরিষ্কার পানির দ্বারা সেচ দিতে হবে। রাস্তার পাশে লাগানো ফসল ট্রাফিকের ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত হতে পারে, এজন্য রাস্তার পাশে ফসল লাগানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

ফসলি জমিতে বায়োচার প্রয়োগ করতে হবে। বায়োচার একটি শক্তিশালী পরিবেশ-প্রতিকারক হিসাবে বিবেচিত।
মাটিতে ভারী ধাতব দূষণ দূরীকরণে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। বায়োচার হলো এক ধরনের চার (char) বা কয়লা যা বাতাসের অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে তাপের সাহায্যে উদ্ভিদ জাতীয় পদার্থ যেমন কাঠ, কাঠের গুঁড়া, আগাছা থেকে তৈরি করা হয়। জমিতে বায়োচার প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির উর্বরতাসহ মাটির গুণাগুণ এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। বায়োচার মাটিতে ধাতব ঘনত্ব হ্রাস করে। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষিতে বায়োচার প্রযুক্তির ব্যবহারের ভূমিকা অপরিসীম।

তাই মাটির দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় গবেষণা, এর প্রতিকারে শিল্প কারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant) স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কঠোর ভাবে অনুসরণ করা, মাটির গুনাগুন রক্ষায় রাসায়সিক সার, কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে জৈব সার, এবং জৈব প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে ভারী ধাতুর দূষণ রোধ করে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।

ছোট বড় ব্যাটারি, কলকালখানার বর্জ্য, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হাসপাতাল ও ক্লিনিক বর্জ্য, গবেষণাগারের বর্জ্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক পদ্ধতিতে ডিসপোজাল (বর্জ্য সংরক্ষণ) করতে পারলে যে কোন দেশ পরিবেশ দুষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে এসব ক্ষতিকর ভারী ধাতুর প্রবেশ নিয়ন্ত্রন করতে পারবে বলে গবেষকরা মতামত দেন।

সুত্রঃ লেখাটি একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ (Environment International 125, 2019:365–385) থেকে তৈরি করা।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,