“মাংকিপক্স” – ২০২২ সালে নতুন মহামারী

স্বাস্থ্য ডেস্কঃ

মাংকিপক্স একটি বসন্তজাতীয় রোগ৷ মাংকিপক্সের জন্য দায়ী ভাইরাসটির নাম MPV (Monkeypox Virus) যা Orthopoxvirus গণের সদস্য৷ এই ভাইরাস গুটিবসন্তের ভাইরাস Variola এর সমগোত্রীয় তবে গুটিবসন্তের মতো ভয়াবহ বা প্রাণঘাতি নয়। ১৯৫৮ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে একটি গবেষণার জন্য পরীক্ষাগারে থাকা বানরদের মধ্যে এই ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ায় এর নাম রাখা হয়েছে মাংকিপক্স। রোগটি আফ্রিকার স্থানীয় এবং বিভিন্ন জাতের আফ্রিকান ইঁদুর এদের বাহক৷ ভাইরাসটির দুটো ধরন আছে৷ পশ্চিম আফ্রিকান ধরন ও মধ্য আফ্রিকান ধরন৷

মাংকিপক্স খুবই বিরল রোগ। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার ক্রান্তীয় বারিবনগুলোতে (Tropical rainforest) এই ভাইরাসের আবাস৷ বিভিন্ন আফ্রিকান প্রাণী যেমন কাঁকড়াভুক বানর (cynomolgus monkey), গ্যাম্বিয়ান ইঁদুর (Gambian pouched rat), ডোরমাইস এবং আফ্রিকান কাঠবিড়ালি এই ভাইরাস বহন করে৷ প্রধান বাহক হিসেবে তীক্ষ্ণদন্তী বা ইঁদুরজাতীয় (গ্যাম্বিয়ান ইঁদুর, ডোরমাইস, আফ্রিকান কাঠবিড়ালি) প্রাণী স্বীকৃত৷

১৯৭০ সালে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে এই রোগ প্রথম মানুষে ধরা পড়ে৷ ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত মোট ৪০০ মানব রোগী শনাক্ত করা হয়৷ এরপর থেকে বিরল এ রোগটি মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় প্রতিনিয়ত ছোট ছোট স্থানীয় মহামারী তৈরি করতে থাকে। যা সে সব দেশে এখন গা-সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে৷

রোগের লক্ষণ:
১. অন্যান্য বসন্ত রোগের মতো এই রোগেও শুরুতে মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, জ্বর, অবসাদগ্রস্ততা।
২. লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া বা লিম্ফ্যাডেনোপ্যাথি মাংকিপক্সের বিশেষ চিহ্নিতকারী লক্ষণ যা কান, চোয়াল, গলা বা তলপেট ও পায়ের সন্ধিস্থলে দেখা দেয়৷
৩. জ্বর হবার কয়েকদিনের মধ্যে বসন্তের ফুসকুড়ি ওঠা শুরু হয় যা অনেকটা গুটিবসন্তের ফুসকুড়ির মতো।
৫. ফুসকুঁড়ি ওঠা শুরু হয় মুখ দিয়ে তারপর হাতের তালু, পায়ের আঙুলে দেখা দেয় ৷ তারপর পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে৷
৬. বিরল ক্ষেত্রে চোখে ও জননাঙ্গেও ফুসকুঁড়ি দেখা দিতে পারে৷ তবে চোখের ক্ষেত্রে অন্ধত্বেক নজির নেই৷
৭. ফুসকুঁড়িগুলো শুরুতে চ্যাপ্টা দাগের মতো থাকে৷ পরে তরল জমে ফুলে ওঠে যা শুরুতে বর্ণহীন এবং পরে হলুদ হয়। পরে নিজেই ফেটে শুকিয়ে যায়৷
৮. দুই থেকে চার সপ্তাহে রোগ নিজে থেকেই সেরে যায় কিন্তু ফুসকুঁড়ির দাগগুলো কালচে হয়ে যায়৷

বিভিন্ন প্রাণীতে MPV (Monkeypox Virus) চামড়ায় কাটা জায়গা বা চোখ, নাক ও মুখের মাধ্যমে প্রবেশ করে৷ মাংকিপক্স মানুষ থেকে মানুষে খুব কমই সংক্রমিত হয়৷ তবে এটা অসম্ভব নয়। আক্রান্ত মানুষের গভীর সংস্পর্শে আসা (যেমন যৌন কর্মকাণ্ড, গা ঘেঁষে বসা), হাঁচি-কাশি থেকে, দৈহিক তরলের (থুথু, চোখের অশ্রু, নাকের সর্দি, রক্ত, বীর্য) মাধ্যমে অন্য মানুষ সংক্রমিত হতে পারে৷

মাংকিপক্সে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এতে মৃত্যুর হার জলবসন্ত ও গুটিবসন্তের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য৷ রোগের আবাস আফ্রিকাতেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৷ দুই ধরনের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকান ধরনে মৃত্যুর হার ১ – ৩.৬% এবং মধ্য আফ্রিকান ধরনে মৃত্যুর হার ১০ – ১২%৷ মাংকিপক্স প্রাণঘাতি নয়৷

মাংকিপক্স রোগের নিজস্ব কোনো প্রতিষেধক (Vaccine) নেই৷ ২০১৯ সালে আমেরিকায় জাইনেওস নামের গুটিবসন্তের প্রতিষেধক প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মাংকিপক্সের প্রতিষেধক হিসেবে অনুমোদন পায় ৷ এছাড়া ‘টেকোভিরিমাট’ নামক ঔষধ আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিভিন্ন ধরনের বসন্ত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পেয়েছে ৷ তার মধ্যে মাংকিপক্সও আছে ৷

২০২২ সালে নাইজেরিয়া থেকে বেড়িয়ে আসা এক লন্ডনবাসী ব্রিটিশ নাগরিকদের মাধ্যমে এই রোগের মহামারীর সূত্রপাত৷ এরপর এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে মোট ১৮ টি দেশে ছড়িয়েছে৷ এখনও পর্যন্ত আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইসরায়েল, ইতালি, নেদারল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগ ছড়িয়েছে ৷ এখনও পর্যন্ত ১৮ দেশ মিলিয়ে ১৭১ জন আক্রান্ত এবং ১১ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে নিতে হয়েছে৷ কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি৷

করোনা ভাইরাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিমান, স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে এ সংক্রান্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে স্বাস্থ্যঅধিদপ্তর থেকে। বন্দরগুলোতে মাংকিপক্সের স্ক্রিনিংও শুরু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে রোগ নিয়ে কেউ দেশে চলে আসলে অধিক জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অসচেতনার কারণে ছড়াতে সময় লাগবে না ৷ এ রোগকে আগে কখনই যৌন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ছড়াতে দেখা যায়নি যা ২০২২ মহামারীতে হচ্ছে ৷ তবে মানুষ থেকে মানুষে এ রোগের ছড়ানোর গতি অনেক কম বলে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক কম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •