এবার নিয়ে নয় ভাঙা দিল তিস্তা
জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
‘তিস্তা নদীর ধারে ছিল বসতভিটা। নিজের ঘরের ধান ও গোয়াল ভরা গরু ছিল। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছিল সুখের সংসার। কিন্তু ভাঙনে সেই বসতভিটা নদীতে গেছে। নদী আমার সব সুখ কেড়ে নিয়ে গেছে। এবার নিয়ে নয় ভাঙা দিল তিস্তা নদী। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খাইতে থাকতে অনেক কষ্ট হচ্ছে’। কথাগুলো বলছিলেন তিস্তা নদীর ভাঙনে সর্বশান্ত হওয়া মকবুলার রহমান (৭০)।
মকবুলার রহমান গাইবান্ধার সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরে গোঘাট গ্রামের বাসিন্দা।
তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। নদীর ভাঙনে আমার সব গেছে। ছোট দুটি ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোন রকম বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু তিস্তার ভাঙনে তা আবারও সড়িয়ে নিতে হয়েছে। তবে এবার তিনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
শুধু মকবুলার রহমান নয়, বন্যায় পানি কমে যাওয়ার পর তিস্তার অব্যহত ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে তিস্তা নদীর পশ্চিম তীরবর্তী এলাকার এক কিলোমিটার ভেঙ গেছে। ফলে পোড়ারচর, গোববাড়ী, গোয়ালবাড়ী, দপ্তর খাটিয়া, কেল্লাবাড়ী, সাহাপাড়া, মাঝিপাড়া, ডাঙ্গারঘাট ও নয়াগাঁ গ্রামের সহ¯্রাধিক পরিবারের বসতভিটা, আবাদি জমি, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে।
সরেজমিনে গোঘাট গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার ভাঙনে তীরবর্তী গোঘাট গ্রামের লোকজন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাদের সাজানো গোছানো সংসার এখন ভাঙনের মুখে। বাধ্য হয়ে অনন্ত ৩০ পরিবার তাদের বসতবাড়ি অন্যত্র সড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া গোঘাট জামে মসজিদটি এখন হুমকির মুখে। যে কোন সময় মসজিদটিও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
গোঘাট গ্রামের বাসিন্দা আয়নাল হক বলেন, ‘আমি বিগত ৫০ বছরেও এমন ভাঙন দেখিনি। তিস্তার তীরেই আমার বাড়ি ছিল। কিন্তু সব নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত আমি আটবার তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছি। এখন আর কিচ্ছু নাই। খালি জীবনটা আছে কোনো রকমে’।
গোঘাট গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জু মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে গোঘাট এলাকার শতাধিক পরিবার তাদের বসতভিটা সড়িয়ে নেয়। বছরের ৭-৮ মাস এসব পরিবার কোন রকম বসবাস করলেও বন্যার সময় পানি উঠায় তারা চরম দূর্ভোগে পড়েন। এরপর বন্যার পানি কমে গেলে নদীর ভাঙনে আবার বসতভিটা সড়িয়ে নিতে হয়’।
তিনি আরও বলেন, ‘ভাঙনের শিকার এসব এলাকার শতশত পবিারের হাজারো মানুষ প্রতিবছর ভাঙা গড়ার খেলায় দিনাতিপাত করছেন। এখন ভাঙনে সবাই তাদের ঘর ভেঙে অন্যত্র সড়িয়ে নিচ্ছেন। এদের অনেকে থাকার জায়গা না পেয়ে বন্যানিয়ন্ত্রন বাঁধ ও আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকে গৃহহারা হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন’।
একই গ্রামের রহিমা বেগম বলেন, ‘বন্যার পানি কমার সাথে গত ১৪ দিনে তিস্তার ভাঙন তীব্রতা অনেক বেড়েছে। প্রতিদিনেই ভাঙছে কামারজানি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। গৃহহারা হচ্ছে বহু পরিবার। ভাঙনে সর্বশান্ত হয়ে এসব পরিবার এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে’।
তবে এসব এলাকার বাসিন্দারা নদী ভাঙনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর গাফিলতির কারণে আজ নদী বেশি ভাঙছে। ভাঙন ঠেকাতে শুস্ক মৌসুমে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় নদী পাড়ের মানুষের এ করুন অবস্থার জন্য তারাই দায়ী। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা বা সরকারের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ নেয় না ভাঙন এলাকার মানুষের।
স্থানীয় সমাজকর্মী সাদ্দাম হোসাইন পবন জানান, বন্যার পানি কমার পর তিস্তার ভাঙন ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। ভাঙন রোধে অনেক প্রচেষ্টার পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি মো. মোতাহার হোসেনসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এরপর থেকে কিছু জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। এছাড়া ভাঙন রোধে সব ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে কামারজানি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জাকির বলেন, ‘প্রতি বছর তিস্তার ভাঙনে হাজারো পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়ছেন। কিন্তু নদীর ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে সঠিক পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই কামারজানির মানচিত্র নদী গর্ভে বিলীন হবে। এ জন্য তিন সরকারের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন’।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী সেলিম হোসেন গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘তিস্তা নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড বেশ কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধে চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া ভাঙনের বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় থেকে বরাদ্দ পেলে নদীর তীরবর্তী বেশি এলাকায় ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে’।

